২০ জুন, আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস। এই দিনে বিশ্বব্যাপী উদ্বাস্তু ও বাস্তুচ্যুত মানুষের মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করা হয়। বাংলাদেশে এই দিবসটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, বিশেষ করে কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায়, যেখানে প্রায় ১৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দীর্ঘ প্রায় ০৯ বছর ধরে বসবাস করে আসছে।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের কারণে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। মানবিকতার খাতিরে বাংলাদেশ সরকার তাদের অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দেয় এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংস্থার সহায়তায় তাদের জন্য কক্সবাজারে শরণার্থী ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়।
প্রথমদিকে রোহিঙ্গারা খুবই অসহায় ও দুঃস্থ অবস্থায় ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক, জাতীয় এবং স্থানীয় এনজিও, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় তারা এখন ক্যাম্পে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে ফেলেছে। বর্তমানে প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবারে একাধিক ব্যক্তি এনজিওগুলোতে বিভিন্ন পদে চাকরি করছে। ফলে তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে।
এই আর্থিক সচ্ছলতা ও সাংগঠনিক শক্তির কারণে অনেক রোহিঙ্গা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে একাধিক ক্যাম্পের মাঝে প্রভাব বিস্তার শুরু করে। ধীরে ধীরে শুরু হয় আধিপত্যের লড়াই, সংঘর্ষ, খুনখারাবি, অপহরণসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। ক্যাম্পগুলোতে গড়ে ওঠে ভয়াবহ ত্রাসের রাজত্ব।
এছাড়াও রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের ভিতরে এখন ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে আসা পণ্য, বিশেষ করে ইয়াবা ও অস্ত্র এখানে প্রবেশ করছে এবং ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক রোহিঙ্গা এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। স্থানীয় জনগণ, যারা একসময় ক্যাম্প স্থাপনের কারণে কিছু কাজ পেয়েছিল, তারা এখন এই রোহিঙ্গাদের প্রভাবের কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ছোট পজিশনের চাকরি, বড় ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগগুলোও এখন রোহিঙ্গাদের দখলে।
অন্যদিকে, বড় বড় পদে যারা আছে তারা বেশিরভাগই কক্সবাজার জেলার বাইরের মানুষ। তারা স্থানীয়দের জন্য খুবই সামান্য সুযোগ রেখে দিয়েছে। যে সকল সংস্থাগুলোতে ভেন্ডরদের মাধ্যমে কেনাকাটা হয়, সেই ভেন্ডররাও আবার বড় অফিসারদের আত্মীয়-স্বজন। সব মিলিয়ে উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় মানুষ এখন এক ধরনের দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে।
রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সচেতন সংগঠন আন্দোলন করে আসছে। তাদের মধ্যে “রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিটি” অন্যতম। কিন্তু এখনও পর্যন্ত প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে কোনো বাস্তব অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তারা কবে নিজ দেশে ফিরবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ অবস্থার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গভীর রহস্য বা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ লুকিয়ে আছে।
বিশ্ব শরণার্থী দিবসে আমরা একদিকে যেমন শরণার্থীদের মানবাধিকার রক্ষার দাবি জানাই, অন্যদিকে স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং জীবিকার অধিকার রক্ষার বিষয়টিকেও গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। কারণ, মানবিক সহানুভূতি কখনোই একটি জাতিগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগের কারণ হতে পারে না।
লেখক: আবদুল মান্নান,উন্নয়ন ও সমাজকর্মী