সবাই যখন নিজের কাজ আর স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত, তখন আমি ভাবলাম—আমাদের উখিয়া উপজেলায় এমন অনেক গুণী মানুষ আছেন, যাঁরা তাঁদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টা নিঃস্বার্থভাবে ব্যয় করেছেন মানুষের সেবায়, সমাজের কল্যাণে। অথচ তাঁদের নাম আজ অনেকটাই বিস্মৃত। আমি চেষ্টা করছি তাঁদের জীবনগাথা, অবদান আর মানবিক সেবার গল্প তুলে ধরতে—যাতে নতুন প্রজন্ম জানে, শ্রদ্ধা করে এবং অনুপ্রাণিত হয়।
এটাই আমার দায়বোধ, এটাই আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। কারণ আমি বিশ্বাস করি—যে দেশে গুণীর কদর নেই, সে দেশে নতুন গুণী জন্মায় না।
সময়ের গর্ভে যাঁরা অনন্ত হয়ে থাকেন :
সময়ের অবিরাম স্রোত অনেক কিছুই ধুয়ে নিয়ে যায়। তবু কিছু কিছু নাম মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অমলিন থেকে যায়। উখিয়ার সেই মাটি, সেই বাতাস আজও বহন করে এক অনন্য নাম—মনিন্দ্র লাল মল্লিক। তিনি ছিলেন কেবল একজন পল্লী চিকিৎসক নন, ছিলেন মানবতার এক চলমান আলোকবর্তিকা।
ডিগ্রি নয়, ছিল হৃদয়ের বিশুদ্ধতা :
মনিন্দ্র বাবুর জীবনে কোনো বড় একাডেমিক ডিগ্রির ঝলকানি ছিল না। কিন্তু মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা আর অন্তহীন মানবিকতা তাঁকে মানুষের অন্তরে এমন এক আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, যা কোনো সনদ বা উপাধি দিয়ে মাপা যায় না। তিনি প্রমাণ করেছিলেন—ডিগ্রি নয়, হৃদয়ের বিশুদ্ধতাই একজন প্রকৃত চিকিৎসকের পরিচয়।
ঔষধের দোকান ছিল যেন এক আশার বাতিঘর :
উখিয়া স্টেশনের এক কোণে ছিল তাঁর ছোট্ট ওষুধের দোকান—যেখানে ছিল না ঝাঁ-চকচকে সাজসজ্জা, ছিল শুধু নির্ভরতার আশ্বাস। বছরের পর বছর, দিনের পর দিন, তিনি রোগীদের পাশে থেকেছেন—কখনো বিনা পারিশ্রমিকে, কখনো নিজ খরচে ওষুধ দিয়ে। রোগীর কষ্ট দেখলে তিনি আর দোকানে বসে থাকতে পারতেন না—ওষুধের ব্যাগ হাতে নিয়ে ছুটে যেতেন দুর্গম পাড়া-মহল্লায়। তাঁর কাছে সেবা ছিল ধর্ম, মানবতা ছিল জাতি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় : নিঃশব্দে যুদ্ধ করা সাহসী হৃদয়
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়, মনিন্দ্র লাল মল্লিক ছিলেন এক নীরব যোদ্ধা। অস্ত্র হাতে না তুললেও, তাঁর হাতেই ছিল আরেক যুদ্ধের অস্ত্র—সেবা ও ভালোবাসা। আহত মুক্তিযোদ্ধা ও অসুস্থ সাধারণ মানুষদের খুঁজে বের করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যেতেন, নিজ হাতে সেবা দিতেন। সেই ভয়ংকর সময়ে জীবন হাতে নিয়েই তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
তাঁর কোনো বড় ডাক্তারি ডিগ্রি না থাকলেও, তিনি ছিলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক আত্মপ্রাণ ছাত্র। প্রচুর মেডিকেল সায়েন্সের বই পড়তেন। শুধু শরীর নয়, মানুষের মন বোঝার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। রোগীকে মানসিকভাবে সাহস দেওয়া ও স্বস্তি দেওয়ার দক্ষতা তাঁকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল।
সবার ‘মনিন্দ্র বাবু’ ছিলেন সবার আপন
ধনী-গরিব, হিন্দু-মুসলিম, শিশু-বৃদ্ধ—সবাই ছিলেন তাঁর কাছে সমান। গরিব পরিবার ওষুধের টাকা না দিতে পারলে তিনি বলতেন, “সুস্থ হয়ে উঠো আগে, টাকা-পয়সা বড় কথা নয়।”
তাঁর হাতে ছিল এক অদৃশ্য মন্ত্র—স্নেহ, ভালোবাসা আর যত্নের সংমিশ্রণে তিনি যেন রোগীর অর্ধেক কষ্ট দূর করে দিতেন। তাই তাঁকে বলা হতো “গ্রামের জীবন্ত হাসপাতাল”।
মানবিকতার এক অনন্ত প্রেরণা :
আজ যখন চিকিৎসা পেশা বাণিজ্যিকতার ছায়ায় ঢাকা পড়ছে, তখন মনিন্দ্র লাল মল্লিকের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সেবা, মানবতা আর ভালোবাসাই চিকিৎসার প্রকৃত ভিত্তি।
তাঁর মতো মানুষদের স্মরণ করাটা শুধু দায়িত্ব নয়, ইতিহাস রক্ষাও বটে।
পরিশেষে বলতে চাই,
মনিন্দ্র লাল মল্লিক কেবল উখিয়ার একজন পল্লী চিকিৎসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানবিকতার এক যুগান্তকারী ব্যাখ্যা। মৃত্যুর বহু বছর পরও উখিয়ার আনাচে-কানাচে, ধুলোমলিন দোকানের চৌকাঠে বা কোনো গাছতলার আড্ডায় আজও কেউ না কেউ বলেন, “মনিন্দ্র বাবু ছিলেন আলাদা মানুষ।”
শত বছর পরও, হয়তো কোনো রোগীর অস্ফুট বাক্যে, কোনো মা-বোনের দোয়ার ভাষায়, বা কোনো শিশুর নিরীহ হাসিতে উঠে আসবে মনিন্দ্র বাবুর সেই অনন্ত মানবিকতার গল্প।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি উখিয়ার এই মহান সন্তান, পল্লী চিকিৎসক মনিন্দ্র লাল মল্লিককে।
উপস্থাপনায়
প্রভাষক শুভংকর বড়ুয়া
পাতাবাড়ি, উখিয়া,কক্সবাজার
তারিখ :২১.০৫.২০২৫
রোজ :বুধবার
নোট :লেখকের কণ্ঠে সতর্কতা ও কৃতজ্ঞতা
এই লেখাটি রচনার সমস্ত কপিরাইট লেখকের নিজস্ব। লেখকের অনুমতি ছাড়া এটি আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে কপি বা পরিবর্তন করে ব্যবহার করা আইনত দণ্ডনীয় এবং অনৈতিক।
এই রচনায় তথ্য, স্মৃতি ও বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করেছেন—উখিয়ার সেইসব মানুষ, যাঁরা মনিন্দ্র বাবুর সেবা পেয়েছেন। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি তাঁর প্রিয় নাতি হিল্লোল দাশ(সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব) -এর প্রতি, যিনি পারিবারিক অনেক তথ্য আমার সঙ্গে আন্তরিকভাবে ভাগ করে নিয়েছেন।