ডিসেম্বর ৬, ২০২৫

দৈনিক উখিয়া

গাইড বই কিনতে বাধ্য করছেন শিক্ষকরা, সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষিত!

নোট ও গাইড বই নিষিদ্ধ হলেও দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে প্রকাশ্যেই চলছে এই অনৈতিক বাণিজ্য।খোদ রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একশ্রেণির শিক্ষক কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বাধ্য করছেন নিষিদ্ধ গাইড বই কিনতে। এর পেছনে কাজ করছে প্রকাশনী সংস্থাগুলোর বিশেষ আর্থিক সুবিধা এবং শিক্ষকদের ব্যক্তিগত লাভের হিসাব, যা শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার ১৯৮০ সাল থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকের নোট বই মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশনা, আমদানি, বিতরণ ও বিক্রয় নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। উচ্চ আদালতের রায়েও গাইড ও নোট বই মুদ্রণ ও বাজারজাত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ২০০৮ সালের নির্বাহী আদেশ এবং ২০০৯ সালের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশেও নোট ও গাইড বই বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।

সর্বশেষ ‘শিক্ষা আইন ২০২০’-এর খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো ধরনের নোট বই বা গাইড বই মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশ বা বাজারজাত করা যাবে না। এই বিধান লঙ্ঘন করলে অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এমনকি কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নোট বই বা গাইড বই কিনতে বা পাঠে বাধ্য করলে বা উৎসাহ দিলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, ব্যবস্থাপনা কমিটি বা পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

আইনের তোয়াক্কা নেই কারো আইন থাকলেও এর বাস্তবায়ন চোখে পড়ছে না। প্রকাশনী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা দিয়ে এই বইগুলো বাজারজাত করছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষকরা এক থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন প্রকাশনী সংস্থাগুলো থেকে। সেই টাকা তারা নিজে রেখে বাকিটা সহকারীদের মধ্যে ভাগ করে দিচ্ছেন। কোনো কোনো প্রধান শিক্ষক একাই সব টাকা আত্মসাৎ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে পাঞ্জেরি, লেকচার, সাকসেস ও ফুলকুঁড়ি এবং মাদ্রাসাগুলোতে আল-আরাফাহ্‌, আলফাতাহ, আল-ইনতেহান, আল-বারাকা কোম্পানির নিষিদ্ধ গাইড বই কিনতে বাধ্য করছেন শিক্ষকেরা। এর ফলে বইয়ের দোকানগুলোতে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে এসব নিষিদ্ধ গাইড ও নোট বই, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং অভিভাবকদের পকেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছে। এ বছর বেশিরভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে লেকচার প্রকাশনীর গাইড বই কিনতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে।

ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অভিভাবকরা রাজধানীর তুরাগ থানার শহীদ মডেল একাডেমির একজন নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক অভিভাবক জানান, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে নিউটন ও লেকচার গাইড কিনতে তাগিদ দিচ্ছেন। এছাড়াও সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির গ্রামার ব্যাকরণসহ প্রতি সেট বই ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে, অথচ এই বইগুলোর কাগজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। তিনি মনে করেন, এর পেছনে উক্ত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বড় ধরনের বাণিজ্য জড়িত।

একই বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “স্কুল থেকে যে সকল সাজেশন বা নোট কিংবা হোমওয়ার্ক দেওয়া হয়, সেগুলোর প্রায় সবই নির্দিষ্ট কোনো গাইড বই থেকে নেওয়া। ফলে ওই গাইড বই ছাড়া আমাদের পক্ষে বাসায় বসে পড়া সম্ভব হয় না।”
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে পদক্ষেপ জরুরি
সরকার কর্তৃক গাইড বই নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সময়োপযোগী হলেও এর বাস্তবায়নের অভাব হতাশাজনক।

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ অভিভাবক মনে করেন, প্রকাশনা সংস্থার প্রতিনিধিরা প্রধান শিক্ষকদের মোটা অঙ্কের টাকা ও অন্যান্য অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে তাদের বই কিনতে বাধ্য করছেন, যা শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঠিক শিক্ষার মানোন্নয়নের স্বার্থে এই অনৈতিক বাণিজ্য অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এই নির্দেশনার পেছনের মূল কারণ এবং এর বাস্তবায়নের পদ্ধতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের গভীরভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।