ডিসেম্বর ৬, ২০২৫

দৈনিক উখিয়া

আরাকান আর্মির নির্যাতনে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বেড়েই চলেছে: সীমান্তে হুমকি

শাকুর মাহমুদ চৌধুরী, উখিয়া থেকে।।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির অত্যাচার, সেনাবাহিনীর বর্বরতা এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ সরকারের হিসাব মতে, ইতোমধ্যে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। তবে এ সংকটের নতুন মাত্রা যোগ করেছে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে চলমান আরেকটি অনুপ্রবেশের ঢল।

গত দেড় বছরে আরও ১ লাখ ১৮ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (RRRC) সর্বশেষ তথ্যসূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তের ২৫টি পয়েন্ট দিয়ে স্থল ও নৌপথে প্রতিদিন গড়ে ৫০০-এর বেশি রোহিঙ্গা আসছে বলে জানা গেছে।

কক্সবাজারের উখিয়া ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে, রাখাইনের বিভিন্ন গ্রাম থেকে নির্যাতনের মুখে রোহিঙ্গারা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছেন। সম্প্রতি অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গা নারী আমিনা খাতুন নিতি বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং আরাকান আর্মি মিলে আমাদের উপর গুলি চালায়, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়, নির্যাতন করে। আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না।

আরেক রোহিঙ্গা জানে আলম বলেন, আরাকান আর্মি আমাদের জিম্মি করে রেখেছিল। কয়েকদিন জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে পরে পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসি।

রোহিঙ্গা তরুণদের নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে মোহাম্মদ ফারুক বলেন, আরাকান আর্মি আমাদের যুবকদের তুলে নিয়ে দাসের মতো কাজ করাচ্ছে। কেউ অমান্য করলে তাদের ওপর চরম নির্যাতন চালানো হচ্ছে।

রহিমা খাতুন বলেন, আমার বোনের মেয়েকে ধরে নিয়ে ধর্ষণ করেছে। গ্রামের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। আমরা বাঁচার জন্যই পালিয়ে এসেছি।

নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা আপাতত আত্মীয়-স্বজনদের ঘরে আশ্রয় নিচ্ছে। ক্যাম্পে জায়গার সংকট প্রকট হওয়ায় নতুন অনুপ্রবেশে প্রশাসনও হিমশিম খাচ্ছে। ক্যাম্পে নিরাপত্তা, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং আশ্রয় নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর সংকট।

৪ নম্বর রাজাপালং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মীর শাহেদুল ইসলাম চৌধুরী রোমান বলেন, সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চেষ্টা করছে, কিন্তু এভাবে প্রতিদিন নতুন রোহিঙ্গা ঢুকতে থাকলে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। এটা একটা আন্তর্জাতিক ইস্যু, জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে সমাধান খুঁজতে হবে।

তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গারা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে, স্থানীয়রাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির মহাসচিব ও পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমরা মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি, কিন্তু এখন আমরা চরম সমস্যায়। সীমান্তে মাদক চোরাচালান, গরু চালান, অনুপ্রবেশ—সবই বাড়ছে। সরকার যদি মানবিক করিডোর চালু করে, সেটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে।

ফরেন সার্ভিস দিবসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আরাকান আর্মিই এখন প্রধান বাধা। তারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান নয় বলে তাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা সম্ভব হচ্ছে না, কিন্তু তাদের বাদ দিয়েও এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়।

রোহিঙ্গা সংকট এখন কেবল বাংলাদেশ নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, মানবিক এবং কূটনৈতিক ইস্যুতে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন বাড়তে থাকা অনুপ্রবেশের হার, অপরাধ, সীমান্ত সুরক্ষা এবং ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ নিয়ে সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকেও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।